বই আর বেতবেড়িয়া

আজ (মানে ২৬ ডিসেম্বর, এই লেখার বানান-কমা-দাঁড়ি ঠিক করে বের করতে করতে তারিখ পাল্টে যাবে জানি) বিকেল চারটের আগেই দ্বিতীয় বইটাও পড়া শেষ হয়ে গেলো। যাহ! গতকালই তো ওনার লেখা এই দুটো বই কিনে আনলাম, আর এর মধ্যেই শেষ!

কী আর করব, পৌনে পাঁচটার মধ্যে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য কলেজ স্ট্রীট। এবার একসাথে পরের তিনটে বই কিনে নেবো। সামনের দুটো ছুটির দিন তো অন্তত চালাতে লাগবে। নাহলে আবার পরের ছুটির দিনের আগে কেনা হবে না।


লেখক স্মরনজিৎ চক্রবর্তী। ভদ্রলোক প্রচুর দৌড় করাচ্ছেন। তার ওপর, ওনার বই তিনবার কিনতে গেছি, আর তিনদিনেই অন্য রকম কিছু ঘটেছে। এমনকি "বেতবেড়িয়া ঘোলা" নামক একটি অজানা স্টেশনে পর্যন্ত ছোটা করলেন সেদিন।


শুরু থেকে বলি। ওনার লেখা প্রথম বইটা পুরো আকস্মিক ভাবেই কেনা। মাঝে মাঝে একদুবার একদম না পড়া বা অজানা লেখকদের বই কিনেছি, দেখার জন্যে যে ভালো লেগে যায় কিনা। সেরকম ভাবেই ওনারটাও কেনা হয়েছিল। অনেকদিন ধরেই বইমেলা বা বইয়ের দোকানে ওনার নামটা চোখে পড়ছিল, তাই গত বইমেলাতেই বোধ হয়, ফেব্রুয়ারি মাসে (মাসটা সঠিক, কারণ বই কেনার পর নাম আর তারিখ লিখে রাখি প্রথম পাতায়), কিনে নিয়েছিলাম একটা বই। সেই বইটা ওনার লেখা প্রথম উপন্যাস - "পাতাঝরার মরশুমে"। কিন্তু কিনে, তারপর অবহেলায় পরে রয়েছিল এতো মাস ধরে, গল্পের বইতে যেটুকু সময় দিয়েছিলাম, সেগুলো অন্যান্য বইরা নিয়ে নিচ্ছিলো। অবশেষে, এই ডিসেম্বর মাসে, মনে হলো এবার পড়ি, তাই পড়তে শুরু করলাম।

এবং এক নিশ্বাসে শেষ করে ফেললাম। দারুণ লাগলো পড়ে। খুব সহজ ভাষা, সহজ পরিস্থিতি, নিয়ে হালকা গল্প। কিন্তু দারুণ গল্প, দারুন স্টোরিটেলিং। আর প্রচন্ড রিলেটেবেল। চরিত্রগুলো দারুণ জীবন্ত। উপন্যাসটা কেন ভালো লাগলো সেটার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ ভাবতে বসলে হয়ত আরো কিছু বের করা যেত, কিন্তু সেসবে আমার এখন আগ্রহ নেই।

ওটা পড়ার পর, সেদিনেই ওনার লেখা পরের উপন্যাসটা - "আমাদের সেই শহরে" - অ্যামাজনে অর্ডার করে দিয়েছিলাম, দু-দিন পরের ডেলিভারি। ডেলিভারি পাবার সাথে সাথে পড়েও ফেললাম, সেটাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পড়া শেষ। এরপর?


আরো পড়তে হবে। ঠিক করলাম যে, যেই ক্রমানুসারে বইগুলোর প্রকাশ, সেভাবেই আমিও পড়বো। তার পরের উপন্যাসটা - "এটুকু বৃষ্টি" - দেখলাম অ্যামাজনে এক সপ্তাহ নেবে ডেলিভারি দিতে, তাও আবার ৭০ টাকা মতো ডেলিভারি চার্জ। চলবে না। এক্ষুনি গিয়ে কিনবো। দিনটা ছিল গত শনিবার, ২০ তারিখ। চলে গেলাম কলেজ স্ট্রীট। প্রথম দোকানে বললো নেই (প্রথমে "ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট"-এ ঢুকেছিলাম, ওদের শোকেসে বাংলা উপন্যাসের বই রাখা আছে দেখে)। তারপর পাশের দোকানটায় পেয়ে গেলাম। বহু বছর কলেজ স্ট্রিট থেকে বই কেনা হয়নি, আমাজন বা বইমেলা বা স্টারমার্ক জাতীয় জায়গা থেকেই কিনতাম আজকাল, তাই আমার কোনো রকম ডিসকাউন্টের প্রত্যাশা ছিল না, কিন্তু দেখলাম, দোকানে ওরা নিজের থেকেই ২০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দিলো। দারুণ তো!

কলেজ স্ট্রীট গিয়েছিলাম ট্রেনে করে, বাড়ি থেকে দশ পনেরো মিনিট হেটে বাঘাযতীন স্টেশন, বাঘাযতীন স্টেশন থেকে ট্রেনে করে শিয়ালদাহ, তারপর হাঁটা। ফিরবো ঠিক করলাম একইভাবে, শীতের দিনে ফাঁকা লোকাল ট্রেনে চড়তে বেশ লাগে আমার। ফাঁকা ট্রেনে, বসে বসে যাবো বলে, বারুইপুর লোকাল ছেড়ে দিলাম, কারণ ওটায় সিট ফাঁকা ছিল না। এরপর এলো ক্যানিং লোকাল, আমার সামনেই ট্রেন ঢুকলো, এবং স্টেশনে দাঁড়ানো লোকজন ওঠার পরও দেখলাম ফাঁকা সিট অনেক রয়েছে। বাঃ, ফাঁকাই থাকবে তাহলে, ভেবে মহা আনন্দে উঠে পড়লাম। সময়টা ছিল বিকেল সাড়ে চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে।

ট্রেন ছাড়তে ছাড়তেই দেখলাম, শিয়ালদাহ স্টেশনেই সমস্ত সিট ভরে গেলো, তারপর কিছু লোক দাঁড়িয়েও রইলো। ভাবলাম, ও ঠিক আছে, বসে আছি, পাঁচটাই তো স্টেশন, টুক করে নেমে যাবো। দরজার কাছের সিটেই তো বসেছি। ভগবান বলে কেউ থাকলে, এই ভাবনা শুনে, মুচকি মুচকি হাসছিলো।

পার্ক-সার্কাসে ট্রেন দাঁড়াতেই হুড়মুড় করে লোক উঠলো, উঠেই চললো। প্যাসেজ তো ছেড়েই দিলাম, সিটের মধ্যের জায়গাটাতেও লোকজন এসে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি প্রমাদ গুনলাম। তবে দেখলাম, এরকম থাকলেও ঠেলে-ঠুলে কোনোভাবে নেমে যাওয়া সম্ভব। ভগবান মনে মনে আবার হাসলো।

বালিগঞ্জ স্টেশনে আবার অতোই লোক উঠলো, কীভাবে তারা ফিট হলো আমি জানি না, কিন্তু হলো। তারপর ঢাকুরিয়া থেকেও লোক উঠলো। নামা তো দূরের কথা, বসে থেকেই নড়াচড়া অসম্ভব আমার জন্যে। কী আর করবো, ঠিক করলাম, যেখানে ফাঁকা হবে, সেখানেই নামবো, নেমে উলটো ট্রেন ধরে বাঘাযতীন চলে আসবো। এদিকে যখন এত ভিড়, উলটো দিকে নিশ্চয়ই ফাঁকা থাকবে।

আচ্ছা, আমাদের চারদিকে এতো "উন্নয়ন" হচ্ছে, কিন্তু এরকম লাইনগুলোতে, ভিড়ের সময়টাতে, ট্রেনের সংখ্যা বাড়াতে পারছে না? আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেও যেরকমভাবে মানুষ যেত, এখনো সেরকমই আছে। জন্তুজানোয়ারকেও যখন নিয়ে যাওয়া হয়, এরকম ঠাসিয়ে নিয়ে যায় না। দরজার কাছে যারা ঝুলছে, সত্যিই প্রাণ হাতে করে নিয়েই তারা রয়েছে। রোজ এরকম যুদ্ধ। কোনো মানুষ যদি রোজকারের এই প্রাণ হাতে নেওয়া মারামারি থেকে বেরোতে চায় হেনতেন প্রকারে, তথাকথিত "অসৎ" উপায়ে, সেটা কি খুব অবাক হবার কিছু হবে?

যাই হোক, এভাবে চলছি, বাঘাযতীন পেরোলো, সোনারপুর পেরোলো। কিন্তু কই, ফাঁকা তো হচ্ছে না! অবশেষে "বেতবেড়িয়া ঘোলা" বলে এক স্টেশনে, কিছু নামতে থাকা লোকের পেছনে অনুসরণ করে, নামতে পারলাম আমি।

জম্মে নাম শুনিনি এই জায়গাটার। শহর ছাড়িয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে চলে এসেছি। এখন দিন ছোট, তাই ইতিমধ্যেই রাতের অন্ধকার জাঁকিয়ে বসেছে। তবে স্টেশনটা ফাঁকা নয়, লোকজন আছে। টিকিট ঘর খুঁজে নিয়ে উলটো দিকের টিকিট কাটলাম। আর তারপর টিকিট কাউন্টারের পাশে যেখানে ট্রেনের সময়গুলো দেওয়া থাকে, সেটায় দেখলাম, পরের ট্রেন আসতে, ঠিক সময়ে এলে, আরো আধঘণ্টা বাকি। শিয়ালদাহ থেকে তো প্রত্যেক দশ মিনিটে আমার ট্রেন পাওয়া যায়, কারণ বজবজ বাদে শিয়ালদাহ সাউথের সব ট্রেনই বাঘাযতীনের ওপর দিয়ে যায় (অন্তত আমার এখনো এটাই ধারণা)। কিন্তু এখানে তো ওরম নেই, এটা ক্যানিং লাইন, এবং দুটো ট্রেনের মধ্যে প্রায় ৩৫-৪০ মিনিটের তফাত। পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে স্টেশনে হাঁটাচলা করছি, এমন সময় মাথায় হঠাৎ খেয়াল এলো, দেখি তো, উবার অ্যাপটা কী বলে।

ওরেব্বাস, "উবার ইন্টারসিটি" পাওয়া যাচ্ছে দেখছি, অ্যাপটিতে একটা গাড়ির আইকনও দেখাচ্ছে কাছাকাছি। ভাড়া দেখাচ্ছে ৭৬৮ (ভাড়ার অঙ্কটা অ্যাপের হিস্ট্রি খুলে দেখে লিখলাম)। সত্যিই কি পাওয়া যাবে? শহুরে অঞ্চলের থেকে এত দূরে উবার গাড়ি অপেক্ষা করছে আমার জন্যে? ঠিক আছে, দেখাই যাক না, বুক করার চেষ্টা করলে কী বলে। করে দিলাম 'কনফার্ম'। 

ওই গাড়িটাই বোধহয় (অ্যাপে তো ওই একটাই গাড়ির আইকন দেখিয়েছিলো বুকিংএর আগে) ভাড়াটা গ্রহণও করে নিলো দেখলাম। ভালোই হলো। কিন্তু তারপরেই মাথায় কু ডাকলো। শহর থেকে এত দূরে, যেখানে ভাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে, এখানে উবার কেন দাঁড়িয়ে আছে? আশেপাশে যত মানুষ দেখছি, তাদের একজনও উবার ব্যবহার করার মতো আর্থিক স্তরে নেই বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে? কোনো কু মতলব নেই তো? খবরে তো কতই অ্যাপ-ক্যাব নিয়ে দুষ্কর্মের কথা পড়ছি। একটু এগিয়ে গিয়ে, ফাঁকা রাস্তায় ধানক্ষেতের পাশে লুকানো শাগরেদ মোতায়েন থাকলে, আর সবাই মিলে আমার ওপর চড়াও হলে, আমার কিছু করার থাকবে না। ওই রাতে, ওইরকম জায়গায়, উবার কেন ছিল, সেটার কোনো উত্তর পাচ্ছিলাম না। কী করা যায়? অন্তত খবর দিয়ে রাখি বাড়িতে, যে আমি কোথায় এবং কোন গাড়িতে উঠছি, যাতে বাড়ি না ফিরলে পুলিশকে যথাযথ তথ্য অন্তত দিতে পারে। কিন্তু মাকে বলা যাবে না, চিন্তা করবে অযথা। তাই গাড়িতে উঠে,  হোয়াটস্যাপে, বোনকে জায়গার নাম, গাড়ির নম্বর, ইত্যাদি সব দিয়ে টেক্সট করে দিলাম। কীভাবে ওই বেতবেড়িয়া ঘোলা তে আমি এসে পড়েছি, ভিড় ট্রেন ফাঁকা হবার অপেক্ষার ফলে, সেটাও লিখে দিলাম।

এরপর গাড়ি চলছিল। যতক্ষণ ধানক্ষেতের (বা চারপাশের ফাঁকা মাঠ? রাত্তিরের অন্ধকারে দুপাশ ফাঁকা ছাড়া কিছুই বোঝা যাচ্ছিলো না) মধ্যে দিয়ে চলছিলাম, গুগল ম্যাপ খুলে বসেছিলাম, উলটো পালটা কোথাও নিয়ে যাচ্ছে কিনা খেয়াল রাখার জন্যে। সত্যি যদি বিপথে গাড়ি চালাতো, তাহলে কী করতাম? কে জানে। যাই হোক, এরপর বারুইপুর এসে পড়াতে স্বস্তি হলো, চেনা (নাম চেনা) জায়গা। তারপর অবশেষে গুগল-এর বলা ঠিক সময়েই, বাড়ির সামনে নামলাম। কিডন্যাপ বা লুট করেনি, এই আনন্দে ৫০ টাকা টিপ্ও অ্যাড করে দিলাম নামবার পর। 

তারপর আর কী, সেদিন রাত্তির থেকে শুরু করে, এক বা দুই সিটিংএই শেষ করে ফেললাম উপন্যাসটা, রবিবারের বা সোমবারের মধ্যেই। ছোট উপন্যাস, তিনটে বা চারটে ফেলুদার বই এর মতো হবে। (বড়ো উপন্যাস বলতে প্রথম আলো, পূর্ব পশ্চিম, শ্রীকান্ত, এগুলো বোঝাচ্ছি)। আবার খুব ভালো লাগলো।


ফলত, আবার যেই ছুটির দিন পেলাম, গতকাল ২৫ ডিসেম্বর, সকালেই আবার বেরিয়ে পড়লাম। এবার একসাথে দুটো বই কিনে নেবো। "ফিঙে" আর "পাখিদের শহরে যেমন"। যাওয়াটা সেই লোকাল ট্রেনেই করলাম, ফাঁকাই ছিল। ফেরার সময় এবার আমি চালাক হয়ে গেছি, ক্যানিং লোকালে উঠবোই না। কিন্তু বই কিনে শিয়ালদাহ পৌঁছাতে গিয়ে হলো অদ্ভুত একটা বিপত্তি। স্টেশনটাকে কিছুতেই আর খুঁজে পাচ্ছি না। শিয়ালদাহের ওভারব্রিজটার তলায় এদিক থেকে ওদিক করছি, কিন্তু স্টেশনে ঢোকার মুখটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে! এটা কি হচ্ছে! আগের দিন তো ঠিক-ঠাক ঢুকে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া ছোটোবেলায় তো কত এই রুট ব্যবহার করেছি, আমার মামাবাড়ি বউবাজারে, বেলেঘাটায় থাকার সময় অটো করে শিয়ালদাহ যেতাম, সেখান থেকে ব্রিজের তলা দিয়ে বউবাজার। আবার কিছুদিন কলেজ স্কোয়ারে সাঁতার শেখার ক্লাসও করেছি, তখন রোজ হেঁটে ওই ব্রিজের তলা দিয়ে পার হতাম, চোখ বন্ধ করে এলাকাটা মুখস্থ ছিল। আর আজ স্টেশনটাই খুঁজে পাচ্ছি না! বড্ডো আঁতে লাগলো অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করতে। গুগল ম্যাপের সাহায্যও নিলাম, কিন্তু তাও কিরম গন্ডগোল হচ্ছিলো। প্রায় আধ ঘণ্টা এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হেঁটে, শেষে জিজ্ঞাসা করতে বাধ্য হলাম। জেনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি ঠিক দশ মিটার সামনে ব্রিজের তলা দিয়ে উলটো দিকে চলে যেতে বললেন, আর গিয়েই দেখি এই তো, শিয়ালদাহ স্টেশন।  

যাই হোক, এবার স্টেশনে ঢুকে ঠিক করলাম ক্যানিং তো নয়, কোনো রকম দূর পাল্লার ট্রেনেই উঠবো না। সোনারপুর বা বারুইপুর লোকালে উঠবো। কিন্তু বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওই সময়টায়, তখন প্রায় দুটো বাজে, ওই দুটোর একটাও নেই। এক ঘন্টার বেশি অপেক্ষা করতে হবে। তখন সামনে একটা ক্যানিং লোকাল, একটা ডায়মন্ড হারবার লোকাল, একটা নামখানা লোকাল। ডায়মন্ড হারবার লোকালে রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে খেয়াল হলো, অরে, পাশেই তো মেট্রো। মেট্রো ধরে বাইপাসের ঢালাই ব্রিজ ('শহীদ ক্ষুদিরাম') স্টেশনে চলে গেলেই তো হয়। ঢালাই ব্রিজ থেকে বাস হোক, উবার হোক, কিছু একটা নিয়ে নেবো। অবশেষে সেটাই করলাম। ওটার পর আর কোনো উল্টোপাল্টা ঘটনা হয়নি সেইদিন।


তারপর, ২৫ তারিখ "ফিঙে" আর "পাখিদের শহরে যেমন" বই দুটো কিনে আজ যখন বিকেল চারটের মধ্যেই পড়া শেষ হয়ে গেলো, আবার মাথায় ভূত চাপলো, এক্ষুনি গিয়ে আর দুটো নিয়ে আসি। নাহ, দুটো নয়, এবার তিনটে নিয়ে নেবো একসাথে। উইকিপিডিয়া খুলে পরের তিনটে প্রকাশিত বই এর নামগুলো দেখে নিয়ে, আজ মেট্রো ধরেই রওনা দিলাম।

আজ আবার অন্যরকম একটা কিছু হবারই ছিল। টালিগঞ্জ স্টেশনে ঢুকে মেট্রো দাঁড়িয়ে গেলো। আর এগোচ্ছে না। এনাউন্সমেন্টে কিছু একটা বলছে, এক বর্ণও বুঝতে পারছি না। কিছুক্ষণ পর এটুকু বুঝলাম, যে ট্রেন ফাঁকা করতে বলছে। কিন্তু ট্রেন তো দেখলাম দুটো দাঁড়িয়ে আছে, আমাদেরটা, আর প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে আরেকটা। কোনটা ফাঁকা করতে বলছে? নাকি দুটোই? কী হলো রে বাবা!

এর মধ্যে যাত্রীরা উঠতে শুরু করেছে। আমিও উঠে প্ল্যাটফর্মে নামলাম। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি, ট্রেনের ড্রাইভার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্ম দেখছেন। যাই, ওনাকে জিজ্ঞাসা করি কী ব্যাপার। জিজ্ঞাসা করতে বললেন, আবার নাকি কেউ সুইসাইড করেছে। শুনে তৎক্ষণাৎ যেটা মাথায় এলো সেটা হচ্ছে - উফফ, সুইসাইড করার জায়গা পায়ে না আর। শহীদ মিনারটা খোলা রাখলে হয়ত মেট্রোতে আসতো না এরা (অবশ্য ওটার ওপরে ওঠা এখনও বন্ধ আছে, না খুলে দিয়েছে, সেটা খোঁজ নিয়ে দেখিনি)। জানি খুবই নির্দয়, অসংবেদনশীল আর স্বার্থপর ভাবনা এটা, কিন্তু তখন এই ভাবনাটাই প্রথম এসেছিল মাথায়। এখন ভাবতে নিজেরই বাজে লাগছে। যদি কেউ গালি দেয় এটা শুনে, সেটা প্রাপ্য আমার। যাই হোক, ইতিমধ্যে কলকাতা মেট্রোর অ্যাপটাতেও নোটিফিকেশন দেখালো, যে ব্লু লাইন শহীদ ক্ষুদিরাম থেকে উত্তম কুমার, আর ওদিকে ময়দান থেকে দক্ষিণেশ্বর, এই দুটো অংশে চলছে, মাঝের জায়গাটা বাদ। কী আর করবো, চলে এলাম স্টেশনের বাইরে, উবার ধরবো। স্টেশনের বাইরে ট্রেন থেকে নামা মানুষের ভিড় তখন। উবার অ্যাপ বের করে "ইন্ডিয়ান কফি হাউস" ডেস্টিনেশনে দিতে দেখালো সাড়ে পাঁচশো টাকারও বেশি ভাড়া। অসম্ভব! আমি সাড়ে সাতশো টাকায় বেতবেড়িয়া ঘোলা থেকে কলকাতা এলাম, আর টালিগঞ্জ থেকে কলেজ স্ট্রীট যাবো সাড়ে পাঁচশো টাকায়? এটা হতেই পারে না! আরেকটু এগিয়ে যাই, এখানে হয়ত সবাই উবার বুক করার চেষ্টা করছে, তাই হয়ত বেশি ভাড়া এখন। এই ভেবে হাঁটা দিলাম। 

রবীন্দ্র সরোবর পার হয়ে গেলো। কিন্তু ভাড়া কমলো না। যাহ বাবা। আরও কিছুটা এগোনোর পর মাত্র ৩০ টাকা কম দেখালো। হাল ছেড়ে দিয়ে ওটাতেই বুক করতে শুরু করেছি, এমন সময় "আমার কলকাতা মেট্রো" অ্যাপটাতে নোটিফিকেশন এলো যে "থ্রু সার্ভিস হ্যাস বীন রিস্টোরড"। ততক্ষণে আমি রবীন্দ্র সরোবর আর কালীঘাটের মধ্যে। তাই আরেকটু এগিয়ে, কালীঘাট থেকে মেট্রো ধরলাম। তারপর "মহাত্মা গান্ধী রোড" স্টেশনে নেমে, বাকি রাস্তাটা হেঁটে চলে গেলাম। এরপর আর সেরকম কিছু ঘটেনি। প্রথম দিনের দোকানটায় গিয়েছিলাম সোজা, যেখানে ২০ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট দিয়েছিলো। কিনে নিলাম পরের তিনটে বই - "বৃত্ত", "বুদ্বুদ" আর "আলোর গন্ধ"। শেষেরটা দেখলাম বেশ মোটা - প্রথম আলোর অর্ধেক সাইজের সমান। মনটা ভালো হয়ে গেলো, বেশিদিন চলবে এটা। কিনে নিয়ে, বাড়ি ফিরলাম। 

ফিরে এই লেখাটা শুরু করলাম।

এর মধ্যে, ইউটিউবে স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর একটা সাক্ষাৎকারে দেখেছিলাম, ইংরেজিতে লিখলে বেশি পাঠক পাওয়া যায়, বেশি পরিচিতি, বেশি রোজগার, এরকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে, চেতন ভগত আর অমীশ ত্রিপাঠীর নাম আনা হল। আমি চেতন ভগতের প্রথম লেখাটা পড়েছি, অমীশ ত্রিপাঠির একটা সিরিজ পড়েছি, এবং আমার মতে, স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর লেখার হাত অনেক বেশি উন্নত, অনেক সচ্ছল, অনেক সহজ। ওনার মাত্র প্রথম পাঁচটা উপন্যাস পড়েছি, তাতেই দেখতে পাচ্ছি ওনার থেকে আরো অনেক অনেক উপহার পাওয়া যাবে। আরো অসাধারণ হবে ওনার ভবিষ্যতের লেখা। ওনার ইংরেজিতে লেখার প্রয়োজন নেই, ওনার লেখা অন্যরাই অনুবাদ করে দেবে ইংরেজিতে।

দেখি এবার এই তিনটে উপন্যাস কবে শেষ হয়। শেষ করার পর যেদিন আবার কিনতে যাবো, সেদিন কি আবার অন্য রকম কিছু হবে?



Comments

Popular posts from this blog

শীতলতার সন্ধানে

মনে থাকবে

ডেটিং অ্যাপ - পরের গল্প