শিল্প: যা বুঝিনি
ইদানিং বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছি, 'আবোল তাবোল' কবিতাটা (প্রথমটা) পড়ে, বা মনে মনে আবৃত্তি করে, মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। আজকেও কবিতাটা বেশ একাগ্রচিত্তে উপভোগ করছিলাম। তখন মনে হলো, এই কবিতাটাকে ছোটদের বইতে কেন স্থান দিয়েছিলেন সুকুমার রায়? ছোটরা তো ওই বয়সে অনুভব করতে পারবে না এর সৌন্দর্য।
এর থেকে ভাবনা প্রসারিত হতে মনে হলো, যে আমার নিজের শিল্প সাহিত্য জগতের সামান্য অভিজ্ঞতার মধ্যে এরকম বেশ কিছু উদাহরণ আছে, যেগুলো, বা যেগুলোর প্রসঙ্গের কোনো তত্ত্ব, আমি বুঝতে পারিনি, যেগুলো প্রশ্ন হয়েই রয়ে গেছে আমার কাছে। সেরকম কিছু না বোঝার বিবরণ এখানে লিখে রাখি।
১: (যেটা দিয়ে শুরু করলাম) আবোল তাবোল কবিতাটাকে কেন ছোটদের বইতে স্থান দিয়েছিলেন সুকুমার রায়। কিছু ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই করেছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু আমি এখনও বুঝতে পারিনি কী ভেবে।
২: দা ভিঞ্চির 'মোনা লিসা'র মাহাত্য কী, আমি এক বিন্দু বুঝতে পারিনি। নিজের চোখের সামনে থেকে দেখে এসেছি। কিন্তু লুভ্র মিউজিয়ামেরই অন্যান্য প্রচুর শিল্প, ছবি বা ভাস্কর্য, 'মোনা লিসা'র থেকে অনেক গুণ বেশি সুন্দর মনে হয়েছিল আমার।
৩: জীবনে যত প্রেমের গল্প বা কবিতা পড়েছি, কমবেশি হলেও সেগুলোর সাথে মোটামুটি একাত্ম হতে বা উপলব্ধি করতে পেরেছি। একটা বিখ্যাত লাইন উপলব্ধি করতে পারিনি, আবার ভুলতেও পারি না: I love you as certain dark things are loved, secretly, between the shadow and the soul.
লাইনটা যতবার দেখি, মনে হয় আশ্চর্য সুন্দর কোনো একটা অনুভূতির হদিশ এখনও পাইনি আমি।
৪: ডোরিস লেসিংয়ের 'দি গোল্ডেন নোটবুক'কে, অনেক জায়গাতেই দেখেছি, ওনার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়, এবং নারীবাদের চূড়ান্ত বইগুলোর মধ্যেও ধরা হয়। এই দুটোর একটি কারণও বুঝতে পারি না। ওনার যে দু-তিনটি বই পড়েছি, তার মধ্যে, উদাহরণস্বরূপ, ওনার লেখা 'মারা এন্ড ড্যান' (এবং তার সিকুয়েল) সাহিত্য হিসেবে অনেক বেশি ভালো লেগেছিলো আমার। আর নারীবাদের বই হিসেবেও এটার গুণ বুঝিনি। 'দি সেকেন্ড সেক্স' এর শুরুর কয়েকটা অধ্যায় পড়েছিলাম, এবং সেটাকে অনেক বেশি স্ট্রাকচারড আর মজবুত মনে হয়েছিল।
৫: ফেল্লিনির '৮ ১/২' সিনেমাটি নিয়ে লোকে এত কেন লাফালাফি করেছে, জানি না। আমার মনে হয়েছে, এটি ফেল্লিনির পাগলামি এক্সপেরিমেন্ট, যেটা করে উনি নিজের মনে হেসেছেন, এবং যারা এটি নিয়ে মাতামাতি করেন, তাদের ওপরেও মনে মনে হেসেছেন। ওনার অন্য অনেক সিনেমা অনেক গুণ বেশি ভালো লেগেছে আমার। যেমন 'লা স্ট্রাডা', 'আমারকোর্দ', 'লে নত্তি দি কাবিরিয়া', 'ফেল্লিনির ক্যাসানোভা' - এগুলো প্রত্যেকটি অসম্ভব সুন্দর।
৬: সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাগুলোর মধ্যে, 'পথের পাঁচালী'কে বহু জায়গাতেই শীর্ষস্থান দেওয়া হয়, বা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, দেখে আমার খুব অবাক লাগে। আমার 'চারুলতা'টাকে মনে হয়েছে একদম পারফেক্ট সিনেমা। আর তাকে টক্কর দিতে পারার মতো হচ্ছে 'নায়ক'।
এইসব শিল্পের কথা ভাবতে ভাবতে, ছোটবেলার একটা স্মৃতির কথা মনে পড়লো। সেটার কথা উল্লেখ করে, লেখাটা শেষ করি।
অনেক ছোটবেলায়, স্কুলে পড়ার বয়সে, 'দেশ' পত্রিকার প্রচ্ছদে একবার সালভাদোর দালির 'দি পারসিস্টেন্স অফ মেমোরি' ছবিটা ছাপা হয়েছিল। আমি তখন দালি কেন, দা ভিঞ্চির নামও বোধ হয় জানতাম না, চিত্রকলার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই হয়নি, এবং বিন্দুমাত্র কৌতূহলও ছিল না। কিন্তু ওই ছবিটা একটা অদ্ভুত, হয়তো ভয় মেশানো, প্রভাব ফেলেছিল আমার অবচেতন মনের মধ্যে। প্রভাবের গভীরতাটা আমি কিছুদিন পরে বুঝতে পারি, যখন ওটা প্রভাবিত একটা দুঃস্বপ্ন দেখি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে সেই স্বপ্নের কথা। তাতে দেখেছিলাম, আমার ঘরের এবং চারপাশের সব জড়ো পদার্থগুলো আস্তে আস্তে তরল আকার ধারণ করছে। দেখেছিলাম, বই-খাতা, পেন-পেন্সিল, চেয়ার-টেবিল, গাছপালা, সবকিছু আস্তে আস্তে তাদের নিজেদের আকার হারিয়ে ওই ছবির জিনিসগুলোর মতো হয়ে যাচ্ছে, ঝুলে পড়ছে, গড়িয়ে যাচ্ছে। আমি হাতের কাছের জিনিসগুলোকে প্রানপনে ঠিক করার চেষ্টা করেও, করতে পারছি না। ভয়ে ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম।
অনেক অনেক বছর পর, বিশ্ববিখ্যাত সব ছবির তালিকা ঘাটতে ঘাটতে, ওই ছবিটা দেখে চমকে উঠি, এবং তখনই প্রথম জানতে পারি যে ওটা এক বিখ্যাত ছবি।
Comments
Post a Comment